বান্দরবান প্রতিনিধি: লোহার দরজার ওপারে কেটে গেছে জীবনের মূল্যবান অর্ধযুগ। অনিশ্চয়তা, নিঃসঙ্গতা আর অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাসে ভরা সেই দিনগুলো শেষে অবশেষে মুক্তির আলো দেখলেন ৭০ বছরের বৃদ্ধ অনিল কান্তি শীল। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে বান্দরবান জেলা কারাগারের ফটক পেরিয়ে বাইরে আসতেই যেন ভেঙে পড়েন তিনি। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয়জনদের দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারেননি। পরিবারের সদস্যদের জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে ওঠেন। সেই কান্না ছিল ফিরে পাওয়ার, হারানো সময়ের, আর দীর্ঘ বঞ্চনার এক নীরব সাক্ষ্য। কাঁপা কণ্ঠে তিনি শুধু বলতে পারেন, “ভাবিনি আর কোনোদিন বাড়ি ফিরতে পারব…”পরিবারের সদস্যরাও তাকে ফিরে পেয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে আজ কারাগারের সামনে যেন এক বেদনাময় পুনর্মিলনের দৃশ্যের জন্ম হয়।
জানা গেছে, ২০২০ সালের নভেম্বরের শুরুতে হঠাৎ করেই তাকে আটক করে পুলিশ। বলা হয়েছিল—তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট রয়েছে। পরে তাকে চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবান জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর বছরের পর বছর কেটে গেলেও পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আদালতে খোঁজ নিয়েও কোনো মামলার সুনির্দিষ্ট নথি পাওয়া যায়নি—এমনটাই অভিযোগ স্বজনদের। এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে তা সংশ্লিষ্ট মহলের নজরে আসে। ওই প্রতিবেদনে তার দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হলে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর (লিগ্যাল এইড) সক্রিয় হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম. জিয়াউর রহমান সেলিম হাইকোর্টে আবেদন করলে আদালত তাকে সংশ্লিষ্ট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সন্তুষ্টি সাপেক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেন। পরে বান্দরবান জেলা ও দায়রা জজ আদালত সেই জামিন অনুমোদন দেন। এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন মুন্না এগিয়ে আসেন এবং বিনামূল্যে তাকে মুক্তির ব্যবস্থা করেন। অনিল কান্তি শীল এতদিন বান্দরবান জেলা কারাগারের চিম্বুক ২ নম্বর ওয়ার্ডে বন্দী ছিলেন। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে এমন অনিশ্চিত বন্দিজীবন তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। তবুও বুকভরা আশা ছিল—একদিন হয়তো ফিরে যাবেন নিজের মানুষদের কাছে।
তার মেয়ে পুষ্পা শীল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম প্রায়। কিন্তু আজ বাবাকে ফিরে পেলাম। যারা পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।” মুক্তির পর অনিল কান্তি শীল বলেন, সংবাদ প্রকাশ না হলে হয়তো আমি আজও মুক্তি পেতাম না। সাংবাদিক মোহাম্মদ হাসানসহ যারা বিষয়টি সামনে এনেছেন, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।” আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম. জিয়াউর রহমান সেলিম বলেন,
“লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হয়। আদালতের নির্দেশনার পর তার মুক্তির খবর পেয়ে সত্যি আনন্দিত। একজন আইনজীবী হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের মূল লক্ষ।” বান্দরবান জেলা কারাগারের জেলার মনজুরুল ইসলাম জানান, জামিনের কাগজপত্র যাচাই শেষে বৃহস্পতিবার সকালেই তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।